" আত্মজ্ঞান " কি?( Atmagyan ..the self realization. )

 "আত্মজ্ঞান"...আত্মার সাথে পরিচয় :-

রাজা জনক গুরু অষ্টাবক্রকে জিজ্ঞাসা করলেন "হে প্রভু জ্ঞান প্রাপ্তি কি ভাবে হয়?  আত্মঅজ্ঞান কি?  মুক্তি কিভাবে প্রাপ্তি হয়?  বৈরাগ্য কিভাবে লাভ করা যায়? এসব আপনি আমাকে বলুন।

ঋষি অষ্টাবক্র উত্তর দেন-যদি আপনি মুক্তি চান তাহলে মন থেকে সব বিষয়বস্তু উপভোগের ইচ্ছা ত্যাগ করে দিন। ক্ষমা, সততা, দয়া, সন্তোষ, তথা সত্যকে অমৃতের মতো পান করুন। আপনি অগ্নি পৃথিবী বায়ু জল আকাশ কিছুই নন। মুক্তি পেতে গেলে তত্বের সাক্ষী চৈতন্য স্বরূপ আত্মা কে জানুন।

যদি আপনি নিজেকে শরীর থেকে আলাদা ভেবে চেতনায় বিশ্রাম করেন, তাহলে তৎক্ষণাৎ সুখ শান্তি এবং বন্ধন মুক্ত অবস্থা প্রাপ্তি হবেন।আপনি ব্রাহ্মণ আদি সকল জাতি থেকে এবং ব্রহ্মচর্য আদি সকল আশ্রম এর থেকেও শ্রেষ্ঠ এবং চোখে অদৃশ্যসমান। আপনি নির্লিপ্ত, নিরাকার এবং এই বিশ্বের সাক্ষী, এটা জেনে সুখী হন।ধৰ্ম অধর্ম দুঃখ তো মস্তিষ্কের সাথে জড়িত, সর্বব্যাপী আপনা থেকে নয়। আপনি না কর্তা  না ভোক্তা, আপনি সাদা মুক্তই আছেন।

সমস্ত বিশ্বের আপনিই একমাত্র হৃষ্টা এবং সদা মুক্ত। এবং আপনার বন্ধন শুধু এইটুকুই যে আপনি অন্য কাউকে হৃষ্টা মনে করেন। অহংকার রূপী মহাসর্পের প্রভাবে আপনি মেনে নিচ্ছেন যে আপনিই কর্তা,  এই বিশ্বাস কে পান করে সুখী হন। আপনি এক বিশুদ্ধ জ্ঞান যার অগ্নির তেজে অজ্ঞানতাকে জ্বালিয়ে দেয়। আপনি যদি মনে করেন আপনি মুক্ত তাহলে আপনি মুক্ত এবং আপনি যদি মনে করেন আপনি বদ্ধ, তাহলে আপনি বদ্ধ। যার যেমন বুদ্ধি তার তেমন গতি হয়। আত্মা বাস্তবে সাক্ষী, সর্বব্যাপী পূর্ণ, এক,  মুক্ত, চেতন,  অক্রিয়,  ইচ্ছা শক্তি রহিত এবং শান্ত। ভ্ৰমবাস একে সাংসারিক মনে হয়। অপরিবর্তনীয় চেতন এবং অদৈত্য আত্মা কে চিন্তন করে আপনি এই ভ্ৰম রূপী অভ্যাস থেকে মুক্ত হয়ে যান। ভাবুন বাহ্যিক সমগ্র বিশ্ব আপনাতেই সমাহিত আছে। ঋষি অষ্টাবক্র বলেন হে পুত্র, বহুকাল থেকে "আমি এই শরীর"এই ভাবনায়  বাঁধা আছে। নিজেকে জ্ঞান রূপী তলোয়ার দিয়ে কেটে এই বন্ধন থেকে মুক্ত হও। 

আপনি অসঙ্গ,  অক্রিয়, স্বয়ং প্রকাশবান এবং সর্বদোষমুক্ত। ধ্যানের মাধ্যমে মস্তিস্ক কে শান্ত করার চেষ্টাটাই আসলে বন্ধন। এই বিশ্ব আপনার দ্বারাই পরিব্যাপ্ত। এবং আপনি একে ব্যাপ্ত করেছেন। আপনি শুদ্ধ এবং জ্ঞান স্বরূপ। নিজেকে ছোট মনে করে ব্যস্ত থাকবেন না। আপনি ইচ্ছা রহিত, বিকার রহিত এবং শীতলতার ধাম। শান্ত হয়ে কেবল চৈতন্য ইচ্ছাধারী হন। আকার কে অসত্য মনে করে নিরাকারে চিরস্থায়ী হয়ে যান। এই তত্ব কে জ্ঞাত হওয়ার পর পুনর্জন্ম আর হবে না। পরমাত্মা এই শরীর এর ভিতরেও বাস করেন এবং বাইরেও বাস করেন। শাস্বত এবং সতত পরমাত্মা সমস্ত প্রাণীর মধ্যে বিদ্যমান। যেমন জল, ঢেউ এবং ঢেউ এর ফেনা পৃথক নয়,  তেমনি আত্মা নিজ থেকে বাহির হওয়া এই বিশ্ব থেকে আলাদা নয়। যেরকম ভাবে বস্ত্র বাস্তবে সুতো থেকে উৎপত্তি তেমনি এই বিশ্ব আত্মারই রূপ। বাস্তবে এই আত্মাই সৃষ্টির স্বরূপ। ভ্ৰম বশে একে সৃষ্টিরূপে দৃষ্ট হয়। প্রকাশই আমার স্বরূপ, সেই প্রকাশ যা বিশ্ব কে প্রকাশিত করে। আমা থেকে উৎপন্ন এই বিশ্ব আমাতেই বিলীন হয়ে যায়। যেমন মাটির পাত্র মাটিতে এবং ঢেউ জলের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। আমি এই শরীর ধারী হয়েও আমি এই সমগ্র বিশ্বে ব্যাপ্ত।  না আমি যাই, না আমি আসি। আমি নিজেকে স্পর্শ না করেই অনাদিকাল থেকে এই বিশ্ব কে ধারণ করে আছি।                                                                                                 


দ্বয়িত্বভাব অর্থাৎ ভেদ ই হলো সমস্ত দুঃখের মূল কারণ। আমি এক চৈতন্য এবং নির্মূল স্বরূপ। আমি কেবল জ্ঞান স্বরূপ, আমি আশ্রয় রহিত। আমার না আছে কোনো বন্ধন, না আছে কোনো মুক্তি। আমাতে স্থিত এই বিশ্বও বস্তুত আমাতে স্থিত নয়। এটা নিশ্চিত যে এই শরীর এবং এই বিশ্ব অস্তিত্বহীন। শুদ্ধচৈতন্য আত্মারই শুধু অস্তিত্ব আছে, এর বেশি কিছু কল্পনা করার নাই। শরীর, স্বর্গ, নরক, মোক্ষ আর ভয় এসব কল্পনা মাত্র। এতে চৈতন্যস্বরূপ এর কি প্রয়োজন?  আশ্চর্য যে অন্যজন এর মধ্যেও আমি অন্যজন কে দেখতে পাই না। তাহলে কার জন্য মোহ করবো?  না এই শরীর আমি, না এই শরীর আমার। আমি জীব, আমি তো চৈতন্য। আমার মধ্যে বেঁচে থাকার ইচ্ছাটাই তো বন্ধন। বাস্তবে আমার জন্মও নেই মৃত্যুও নেই।

ঋষি অষ্টাবক্র বলেন "আত্মাকে অবিনাশী এবং এক জেনো, নিজেকে অজ্ঞান বসত  বস্তুর সঙ্গে বাঁধা হয়ে যায়। আত্মা তো চৈতন্য, শুদ্ধ এবং অত্যন্ত সুন্দর। তাহলে জ্ঞানেন্দ্রিয়তে আসক্ত হয়ে এই মলিনতা কেন?  জানো যে তুমিই সবপ্রাণীতে স্থিত এবং তোমাতেই সবপ্রাণী স্থিত। তাই মমতা ভাবনা তৈরি হওয়াটাই আশ্চর্য। একব্রহ্ম তে  আশ্রয় গ্রহণকারী এবং মোক্ষ এর জ্ঞানী কে আমোদ প্রমোদ দ্বারা উৎপন্ন কামনা দ্বারা বিচলিত হওয়া টাই আশ্চর্য।"

ইহলোক এবং পরলোক থেকে মুক্ত, এক, নিত্য এবং অনিত্যের জ্ঞানীর মোক্ষলাভ এ ভয়ভীত হওয়া টাই একরকম  আশ্চর্য। সদা আত্মদর্শনকারী বুদ্ধিমান ব্যক্তি না প্রসন্ন হন, না দুঃখিত হন। যে ব্যক্তি নিজ শরীর কে এবং অন্য শরীর কে আলাদা দেখেন না তাকে প্রশংসা অথবা নিন্দা বিচলিত করবে কিভাবে? 

 সমস্ত জিজ্ঞাসারহিত এই বিশ্ব কে মায়া কল্পনাকারী স্থিতপ্রজ্ঞা ব্যক্তি আসন্ন মৃত্যকে ভয় করে না। নিরাশাতেও সমস্ত ইচ্ছা রহিত স্বয়ং কে জ্ঞানের মাধ্যমে প্রসন্ন মহাত্মার আর কার সাথে তুলনা করা যায়? বিষয় এবং আন্তরিক আসক্তিকে ত্যাগ কারী,  সন্দেহমুক্ত ইচ্ছাধীন ব্যক্তিকে স্বতঃআগত ভোগ বস্তু দুঃখী অথবা সুখী করতে পারে না। ঋষি অষ্টাবক্র বলেন যিনি নিজ আত্মাকে জানেন তিনি বাহ্যিক এই সংসার পরিস্থিতি কে খেলা রূপে গ্রহণ করেন। তাঁকে সাংসারিক স্থিতিতে বোঝা রূপে গ্রহণকারী ব্যক্তির সাথে তুলনা করা যায় না। সেই ব্রহ্মকে জ্ঞাত হওয়ার পর অন্তঃকরণে পাপ অথবা পুণ্যের স্পর্শ হয় না। যে মহাপুরুষ নিজেকেই সমস্ত জগৎরূপে জানেন তাঁর সেচ্ছাকে বর্তমান স্থিত কারো আটকানোর সামর্থ নেই। ব্রহ্ম থেকে ঘাস পর্যন্ত সমস্ত প্রাণীর মধ্যে শুধুমাত্র আত্মজ্ঞানীই ইচ্ছা এবং অনিচ্ছা কে ত্যাগ করতে সমর্থ হয়। যিনি আত্মাকেই ঈশ্বর এবং জগৎকেই ঈশ্বর জানেন তিনি কোনো প্রকারে ভয়ভীত হন না। 

ঋষি অষ্টাবক্র বলেন "তোমার কারো সাথে সংযোগ নেই। তুমি শুদ্ধ, তাই তুমি কি ত্যাগ করতে চাও? সম্মিলন বস্তু কে সমাপ্ত করে দিয়ে ব্রহ্মযোগে একরূপতাকে প্রাপ্তি করো। যেমনভাবে সমুদ্রের মধ্যে ফেনার সৃষ্টি হয়, তেমনি এই বিশ্ব এক আত্মা থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। ওই সমুদ্রেই বিলীন হবে। নিজে দুঃখ এবং সুখকে সমান, আশা এবং নিরাশার মধ্যে সমান এবং জীবন ও মৃত্যু কে সমান সত্য জেনে একরূপ ব্রহ্মকে প্রাপ্তি করো।"

আমি সমস্ত প্রাণীতে আছি এবং সমস্ত প্রাণী আমাতে আছেএটাই জ্ঞান। শুধু একরূপে স্থিত হওয়াটাই দরকার।

ঋষি অষ্টাবক্র বলেন..বন্ধন তখনই আছে যখন মন কিছু ইচ্ছা প্রকাশ করে,  শোক করে,  কিছু ত্যাগ করতে চায়, বা কিছু গ্রহণ করতে চায়,  কখনো প্রসন্ন হয়, তো কখনো ক্রোধিত হয়। কিন্তু মন যখন ইচ্ছারহিত হয়,  শোক করে না কোনো কিছু গ্রহণ বা ত্যাগ করে না। ক্রোধ বা আনন্দিত হয় না, তখনই মুক্তি লাভ হয়। কোনো কিছুর আসক্তি রহিত হতে পারলেই মুক্তি লাভ সম্ভব। যতক্ষন আমি বা আমার ভাব আছে ততক্ষন বন্ধন আছে। আমি বা আমার ভাব নষ্ট হলেই মুক্তি।

গুরু 'ঋষি অষ্টাবক্র' এবং শিষ্য 'রাজা জনক' এর মধ্যে কথোপকথন:-

প্রথম প্রকরণ:-

জিজ্ঞাসু রাজা জনক গুরুর বন্দনা করার পর, আত্মজ্ঞান পাওয়ার লালসায়, ঋষি অষ্টাবক্রকে বিনয়-পূর্বক জিজ্ঞাসা করলেন.. হে গুরুদেব, সত্য  জ্ঞান এর প্রাপ্তির সরল উপায় কি? মুক্তি পাওয়ার সাধন কি? এই ভবসাগর থেকে কিভাবে উদ্ধার হওয়া যায়? এবং আসক্তি কে কি করে ত্যাগ করা সম্ভব ? আপনি আমাকে এই সকল প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তুই কৃতার্থ করুন:- 

1)অষ্টাবক্র  বললেন যে মুক্তির ইচ্ছা যিনি রাখেন এরকম জিজ্ঞাসু কে সর্বপ্রথম বিষ স্বরূপ বিষয় আসক্তি কে ত্যাগ করতে হবে, যাহা মায়ার বন্ধনে সহায়ক। বন্ধনকে নষ্টকারী ক্ষমা, দয়া, সরলতা, সন্তোষ এবং সত্যকে অমৃত রূপে সেবন করা দরকার। 

2)মানুষ পঞ্চভূত নয়, মানুষ না পৃথিবী, না আকাশ, না বায়ু, না অগ্নি, আর না জল। তিনি তো সেতু চৈতন্যস্বরূপ আত্মা। পঞ্চভুত তো কেবল সাক্ষী। পরম মুক্তির ইচ্ছা যাঁরা রাখেন তাঁদের 'আত্মার' আসল পরিচয় জানার প্রয়োজন। 

3)অষ্টাবক্র বলেন যদি মানুষ স্বয়ং কে দেহ থেকে আলাদা ভেবে নিজের মন কে বিশ্রাম দেন তাহলে তৎকাল তিনি সব বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে সুখ শান্তি এবং আনন্দের অনুভব করেন। 

4) আপনি ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় আদি কোন বর্ণ নন। আপনি কোন আশ্রমের  ব্যক্তি ও নন। না আপনি কোন চোখ কান আদি ইন্দ্রিয়ের বিষয়। আপনি হলেন অসঙ্গ, নিরাকার এবং সমস্ত বিশ্বের সাক্ষী। এমনটা জেনে আপনি সুখী থাকুন। 

5) হে বিভু, ধর্ম এবং অধর্ম, সুখ এবং দুখ, এগুলো সবই মনের বিষয়। এইসব আপনার জন্য নয়। না আপনি কর্তা, না আপনি ভোক্তা। আপনি তো সর্বদা মুক্ত থাকেন।

6)আপনি এক, সবার স্রষ্ঠা এবং সদা মুক্ত। আপনার বন্ধন এই যে.. আপনি নিজেকে ছেড়ে অন্যকে স্রষ্টা দেখেন।

7)আমি স্রষ্টা' এইরকম অহংকার রুপী বিশাল কল্পনা দ্বারা আপনি দংশিত হয়ে আছেন। 'আমি কর্তা নই',এরূপ বিশ্বাস রুপী অমৃতকে পান করে আপনি সুখী হয়ে যান।

8)আমি এক বিশুদ্ধ বোধ, এরকম নিশ্চিত রুপী অগ্নিধারা অজ্ঞানকে জ্বালিয়ে আপনি সুখ রহিত হয়ে যান, সুখী হয়ে যান।

19)এই বিশ্বকে যেরকম ভাবে দেখা যায় সেটা আসলে একটা ভ্রম। যেমন অন্ধকারে পড়ে থাকা দড়িকে সাপের মতো দেখে ভয় মনে হয়। তেমনি এই বিশ্বে অস্পষ্টতার কারনে মানুষ দুঃখী আছে । বাস্তবিক বিষয়কে  যিনি বুঝতে পারেন,তিনি পরম সুখে থাকেন।

10)মুক্তির অভিমানী মুক্ত থাকেন এবং বদ্ধের অভিমানী বদ্ধ থাকেন, এটাই হল কিংবদন্তি সত্য। যাকে বলে যাইসা মতি বৈশা গতি ।

11)আত্মা হল সাক্ষী, স্বরূপ, ব্যাপক, পূর্ণরূপ, এক, মুক্ত, চৈতন্য স্বরূপ, ক্রিয়া রহিত, অসংখ্য, নিষ্পৃহ এবং শান্ত। ভ্রমবশত এই আত্মা সংসার কে অনুভব করে, যেটা বাস্তব সত্য নয় ।

12) যখন জীবাত্মা নিজেও স্থুল এর আভামন্ডল এর ভ্রমে পড়ে থাকে, তখন তার মুক্তি সম্ভব নয়। মুক্তির জন্য আত্মাকে বাহ্যিক নয়, আন্তরিক আভা কে জাগ্রত করে, তাতে কুটস্থ অর্থাৎ দৃঢ় হবে থাকতে হবে। অদ্বৈত রূপকে কে নিরন্তর চিন্তন করা দরকার।

13) হে বৎস,  তুমি দেহ অভিমানী গ্রস্ত। দেহ কে চিরকাল সর্বস্ব স্বীকার এসেছো। এই দেহপ্রিয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কারণে তুমি নিজে দুঃখ কষ্ট তৈরিকরে নিয়েছো। এই পাশ কে না ভেঙ্গে দিলে তোমার মুক্তি সম্ভব নয়। অতএব জ্ঞান এর অনুভব রুপী খড়্গ দিয়ে সমস্ত বন্ধন কে কেটে সুখী হয়ে যাও।

14) আত্মা হলো অসঙ্গ অর্থাৎ আত্মার কোন সঙ্গীর প্রয়োজনীয়তা নেই। আত্মা কর্ম রহিত এবং স্বপ্রকাশী। কারণ সূর্য চন্দ্র সব ওর মধ্যে স্থিত। আত্মা সব দোষ থেকে মুক্ত এবং সব দোষের উপরে, এইসব কথা কে জেনে কিছু লোক সমাধি বা ধ্যান কে মুক্তির সাধন বানিয়ে চেষ্টা করেন কিন্তু জানেন না চেষ্টা করাটাও তো কর্ম।

15) এই সমস্ত বিশ্বসংসার তোমার মধ্যেই সমাহিত আছে। এবং তুমি সমস্ত বিশ্বসংসারের মধ্যে সমাহিত। সত্য হল এটাই যে তুমিই বিশ্ব এবং সারা বিশ্বের মধ্যে তুমিই। তুমি সর্বদা মুক্ত এবং শুদ্ধ স্বরূপ। শুধু ক্ষুদ্র প্রবৃত্তি তোমার মনকে ভ্রমিত করে তোমাকে বিকার প্রিয় তৈরি করেছে এবং তোমাকে সত্য থেকে দূর করেছে।

16) তুমি  আত্মা, পক্ষপাত রহিত এবং পূর্ণরূপে নির্বিকার। তার উপর সবই নির্ভরশীল, কিন্তু সে কারো উপর নির্ভর নয়। তার প্রবৃতি অত্যন্ত শীতল এবং ক্রোধ তাকে স্পর্শ করতে পারে না। সকল গুণ তারই, অতএব তুমি নিজেকে নিজের স্বরূপে  স্থিত কর, চৈতন্য স্বরূপ হয়ে ওর মধ্যে হয়ে যাও।

17) যেমনভাবে দর্পণের মধ্যে নিজের প্রতিবিম্ব দেখলে যে জিনিস বাহিরে থাকে, সেটাই দর্পণের ভেতরে দেখা যায়। ঠিক তেমনি আত্মা অর্থাৎ ঈশ্বর যা তুমি বাইরে আছো সেটাই তুমি ভিতরে আছো। আত্মার রূপী ঈশ্বর প্রত্যেক  দেহ ধারী র বাইরে এবং ভিতরে বিরাজমান থাকেন।

18)যেমনভাবে আকাশ সর্ব ব্যাপী রূপে ঘরের বাইরে এবং ঘরের ভেতরে  দুই জায়গাতেই বিদ্যমান, তেমনি সর্বব্যাপী ব্রহ্ম ও এই সমস্ত বিশ্বের কোনায় কোনায় সমানভাবে ভেতরে এবং বাইরে ব্যাপ্ত। সম্পূর্ণ জগত তাঁহারই  মধ্যে সমাহিত আছে এবং তিনি সম্পূর্ণ জগতের সমাহিত আছেন।

 দ্বিতীয় প্রকরণ :-

1)রাজা জনকের মধ্যে গুরু কৃপার দ্বারা আত্মবোধ হয়ে গেল এবং উনি অনায়াস ভাবে বলে উঠলেন.. হ্যাঁ, কত আশ্চর্যের বিষয়, আমি আত্মা রূপে নিরঞ্জন, সম্পূর্ণ শান্ত, বিশুদ্ধ বোধ, এবং সংসার থেকে বিরাগ, এটা আমি আজ জানতে পারলাম।কত আশ্চর্যের বিষয় যে.. আমি জীবন ভর আমি মোহগ্রস্ত ছিলাম।

2)যেমনভাবে আমি এই শরীরকে একাই প্রকাশিত করে থাকি, তেমনিভাবে আমি এই সম্পূর্ণ সংসার কেও প্রকাশিত করি। এবং এই জন্যই এই পুরো ব্রহ্মাণ্ড রূপী সংসার আমারই, অথবা এই সংসার বাস্তবে কিছুই নয়।

3)গুরুদেব, আশ্চর্যের বিষয় হল.. যখনই  দেহ রুপি মোহ ত্যাগ হয়ে গেছে এবং এই মহাবিশ্বের প্রতি আমি আসক্তি রহিত হয়েছি, এখন আমার দ্বারা ক্ষণমাত্র প্রয়াসের দ্বারাই পরমাত্মার সাক্ষাৎ দর্শন করতে পারছি।

4)যেমন জলের মধ্যে উৎপন্ন ঢেউ এবং ফেনা, অথবা বুদবুদা, জলেরই অংশ অর্থাৎ সেটা জল থেকে ভিন্ন নয়।তেমনি সমস্ত এই জগত আত্মা থেকে আলাদা নয়, সমস্ত চরাচর ওই আত্মার মধ্যেই সমাহিত এবং আত্মা থেকেই উৎপন্ন। এটাই পরম সত্য।

5)যেমন গভীরভাবে বিচার করলে দেখা যায়, আমরা যে বস্ত্র পরিধান করি সেটা গাছেরই তন্তু। তেমনি বিচার করলে পরিষ্কার বোঝা যায় এই সংসার এই আত্মারই সত্তা। 

6)যেমন আখ থেকে বের করা শর্করা আখেরই অংশ, তেমনি আমার থেকে তৈরি এই সংসার আমারই মধ্যে ব্যাপ্ত।

7)যতক্ষণ পর্যন্ত আত্মজ্ঞান হয় না, ততক্ষণ পর্যন্ত এই জগত সত্য মনে হয়। বাস্তবে সেটা ভ্রম। আত্মজ্ঞান হয়ে গেলেই ভ্রম নষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ বিশ্ব কে আর ভাসিত মনে হয় না। যেমন, ভ্রম হয়ে থাকলেই দড়িকে সাপের মতো মনে হয়, কিন্তু ভ্রম দূর হয়ে গেলে সেটার সত্যতা জানা যায়। এটাও তেমনি বিষয়।

8) এই যে প্রকাশমান বিশ্ব রয়েছে, এই বিশ্ব আমার প্রকাশ দ্বারাই প্রকাশিত, এর বেশি কিছু নয়। আমি আত্ম-প্রকাশ এবং আমার প্রকাশই সমস্ত বিশ্বকে কনায় কনায় প্রকাশিত করছে।

10) আজ আমার সত্য জ্ঞান হল যে.. আমার থেকেই উৎপন্ন এই মহাবিশ্ব এবং তেমনি ভাবে আমার মধ্যেই সমাহিত হয়ে যায়, আমার মধ্যেই বিলীন হয়ে যায়। যেমনভাবে মাটির তৈরি পাত্র শেষে মাটিতেই মিলিত হয়, জলের মধ্যে ওঠা ঢেউ শেষে জলের মধ্যেই মিলিত হয় এবং সোনার তৈরি আভূষণ শেষে শোনাতেই মিলিত হয় এটাও সেভাবেই ঘটে।

11) আমি আশ্চর্যময় এবং আমাকেই নমস্কার। ব্রহ্মা থেকে শুরু করে এক ক্ষুদ্র ঘাস পর্যন্ত জগতের নাশ হলেও আমার নাশ হয় না। 

12) আমি আশ্চর্যময়, আমাকেই নমস্কার। আমি দেহধারী হলেও অদ্বৈত। আমি না কোথাও যাই, না কোথাও আসি। আমি এ বিশ্বে ব্যাপ্ত এবং স্থিত।

13) আমি আশ্চর্যজনক এবং আমাকেই নমস্কার। এই সংসারে আমার সমান নিপুন কেউ নেই। কারণ আমি শরীরকে স্পর্শ না করেই, আমি সারা বিশ্বকে ধারণ করে আছে।

14) আমি আশ্চর্যজনক, আমাকেই নমস্কার। আমার কিছুই নেই অথবা সবকিছুই আমার। এটাই মন এবং বাণীর বিষয়।

15) জ্ঞান,  জ্ঞেয় এবং জ্ঞাতা এই তিনটিরই অস্তিত্ব নেই। এই তিনটি অ-বাস্তবিক। এই তিনটি অজ্ঞানতা বসত ভাসে। আমিই সেই নিরঞ্জন।

16) আশ্চর্যের বিষয় দৈত্ব ভাবই হলো দুঃখের মূল। যাহা কিছুই দৃষ্টিগোচর হয়, অর্থাৎ চর্মচক্ষু দ্বারা  দেখা যায়, তা সব মিথ্যাএবং মায়া। এই সকল বস্তুর মধ্যে শুধুমাত্র আমিই আছি যা অদৈত্ব, আর সব দোষ থেকে রহিত, বিশুদ্ধ।

17) আমি কেবলমাত্র বিশুদ্ধবোধ এটা নিশ্চিত। অজ্ঞানের কারণে আমার মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন বিশেষন সকল কল্পনা করে দেওয়া হয়েছে। এখন বিচারপূর্বক এটাই স্পষ্ট যে.. আমিই সেই, যার কোন বিকল্পই নেই অর্থাৎ নির্বিকল্প ভাবে আমি আমাতেই স্থিত।

18) আশ্চর্যের বিষয় এই যে মহাবিশ্ব আমার মধ্যেই রয়েছে মরলে মনে হয়, তা আসলে আমার মধ্যে নেই। কারণ আমি কোন বন্ধনে থাকি না, আমি মোক্ষের ইচ্ছাও রাখি না। আমি কারো আশ্রিত নই। আমি পরম শান্ত এবং সকল প্রকার ভ্রম থেকে মুক্ত।

19) এই সংসার, যাহা সাকার রূপে দৃশ্যমান হয়, বাস্তবে এর কোন অস্তিত্ব নেই, এটাই পরম সত্য। ইহা কেবল কল্পিত বিশ্ব যা কল্পনার দ্বারাই দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। অস্তিত্বহীনকে দেখা স্বপ্নেরই মত। কেবল আত্মাই হলো এবং চৈতন্য।

20) এই শরীর, স্বর্গ, নরক, বন্ধন, মোক্ষ অথবা ভয়, এসব কল্পনা মাত্র। এতে আমার চৈতন্য আত্মার কোন প্রয়োজন নেই।

21) আশ্চর্যের বিষয়  সকল জীব,জন্তু জড়বস্তু সমূহের মধ্যেও দৈত্ব ভাব দেখা যায় না। এটা আশ্চর্যবশত হয়েছে। তাহলে আমি কাকে প্রেম করি?

22) আশ্চর্যের বিষয় হল.. সমুদ্ররুপী আমাতে চিত্ররূপী বায়ুর আগমনে, শীঘ্রই এই বিচিত্র জগৎরূপী তরঙ্গের আবির্ভাব হয়।

23) এই অনন্ত মহাসাগর রূপ আমাতে চিত্তরূপী বায়ু শান্ত হয়ে গেলে, এই জগত রুপি নৌকা বিলীন হয়ে যায়।

24) আশ্চর্যের বিষয় হল.. অনন্ত মহাসাগর রূপ আমাতে জীব রূপ তরঙ্গ ওঠে, পরস্পর সংঘর্ষ করে, খেলা করে এবং পরে স্বভাবতই লয় হয়ে যায়।

তৃতীয় প্রকরণ :-

1)ঋষি অষ্টবক্র বলেন, আত্মাকে এক এবং অবিনাশী জেনেও তুমি আত্মজ্ঞান রুপী বীর, ধন অর্জনের জন্য আসক্তি কেন?

2)আত্মা থেকে অনভিজ্ঞ, অজ্ঞানী,অজ্ঞানতার কারণেই সংসারের বিষয়ের প্রতি রস আস্বাদিত হয়, যশ প্রীতি হয় এবং বিষয়ের মধ্যেই বিচরণ করেন ।

3)মহাসাগরের মধ্যে যেভাবে ঢেউয়ের উৎপত্তি হয়, তেমনিভাবে আত্মা থেকে এই বিশ্বের উৎপত্তি হয়। না তরঙ্গ স্থায়ী, না এই মহাবিশ্ব স্থায়ী। তাহলে তুমি কেন নিজে সবকিছু জেনেও দিন-দরিদ্রের মতো দৌড়াদৌড়ি করছ? 

4)আত্মা শুদ্ধ, চৈতন্য এবং অতি সুন্দর যেনেও কেমন করে কোন ব্যাক্তি ইন্দ্রের বিষয়ে অত্যন্ত আসক্ত হয়ে মলিনতপ্রাপ্ত হয়?

5)সব জীবের মধ্যেই আত্মা এবং সবার তার মধ্যে সব ভূত। এটা জেনেও মনের মধ্যে মমতা উৎপন্ন হয়। এটাই আশ্চর্য বিষয়। 

6)পরম অদৈত্ব তে স্থিত এমন মুখ্য লাভের জন্য উদ্ধত পুরুষ কাম বসে বশীভূত হয়ে ব্যাকুল হয়ে যায়। এটাই আশ্চর্যের বিষয়। 

7)কাম হলো উদ্ভূত জ্ঞানের শত্রু, এটা জেনেও অতি দুর্বল এবং অন্তকাল প্রাপ্ত পুরুষেরা কাম হোক এর ইচ্ছা করে। এটাই আশ্চর্য। 

8)যিনি ইহলোক এবং পর লোকের ভোগ থেকে বিরক্ত এবং যিনি নিত্য এবং ও অনিত্যের বিবেক রাখেন, তিনিও মোক্ষ থেকে ভয় করেন, এটাই আশ্চর্যের বিষয়।

9)ধৈর্যবান এবং আত্মজ্ঞানী পুরুষ যদিও তিনি যতই কষ্ট সহ্য করুন সহ্য, করুন পীড়ার মাধ্যমে পীড়িত হন, তথাপি তিনি একাত্মবোধে রমিত থাকেন, তাঁর মধ্যে না কোন প্রকার আনন্দ অনুভূত হয়, না ক্রোধ অনুভুত হয়। 

10)যে আত্মা শরীরের সত্তাকে পৃথক ভাবেন না অর্থাৎ যিনি নিজের ক্রিয়াশীল শরীরকে অন্যের শরীরের থেকে আলাদা ভাবেন না এবং সবার মধ্যে নিজেকে দর্শন করেন, এরকম মহান আশয় যুক্ত জ্ঞানী নিজের প্রশংসা এবং নিন্দার দ্বারা কখনো হরষিত বা ক্রোধিত হন না। 

11)যে ব্যক্তি কোন প্রকার কৌতুহল থেকে বিরক্ত থাকেন, তাঁর কাছে এই সমস্ত বিশ্ব মায়া রূপে পতিত হয়। এমন ধৈর্যবান জ্ঞানী পুরুষ কখনো মৃত্যুর থেকে ভয় পান না। 

12)যে মহৎ ব্যক্তি তাঁর মনে নিরাশার মধ্যেও স্পৃহা রাখে না, সেই আত্মজ্ঞানী তৃপ্ত পুরুষকে কার সঙ্গে তুলনা করা যায়?

13) যে স্থিরপ্রজ্ঞ জ্ঞানী এই সত্যকে খুব ভালোভাবে জানেন যে.. তিনি যে দৃশ্যমান জগত দেখছেন সেটা বাস্তবে অস্তিত্বহীন, সেটা বাস্তবে অবস্থিত নয়, আর না কোনদিন হবে। ধৈর্যবান বিবেকবান পুরুষের দৃষ্টিতে এই সংসারে কি গ্রহণযোগ্য সেটা তাঁরা ভাল করেই জানেন। 

14) যে জ্ঞানী ব্যক্তি নিজের অন্তঃকরণকে নির্মল করে নেন এবং নির্ভয় ও নিঃসঙ্কোচ হয়ে ইচ্ছাকে ত্যাগ করে দেন। সেই সৌভাগ্যপ্রাপ্ত ব্যক্তির না কোন ভোগে কষ্ট হয়, না কোন বিষয়ে তুষ্টি আসে।

 চতুর্থ প্রকরণ :-

1)ধৈর্যবান আত্মজ্ঞানী মানুষ নিশ্চিত রূপে বিষয় ভোগ করলেও তিনি ওই মতিমুড় অজ্ঞানীর মত ভোগ করেন না। মতিমুড় ব্যক্তি সাংসারিক লিপ্সাতে কন্ঠ পর্যন্ত ডুবে থাকেন, যেটা ধৈর্যবান পুরুষ থাকেন না।

2)যেই পথ প্রাপ্ত করার জন্য ইন্দ্রাদি দেবতা ও দীন হীন হয়ে যাচনা করেন না। সেই পদে স্থিত হয়েও আত্মজ্ঞানী ব্যক্তি হর্ষিত হন না এটাই আশ্চর্য বিষয়।

3) ওই পদ কে জিনি জানেন, তাঁর অন্তঃকরণকে পাপ অথবা পূর্ণ স্পর্শ করতে পারে না। যেমন ভাবে আকাশের সম্বন্ধ আকাশে ভাসমান ধোঁয়ার সঙ্গে কখনো হয় না।

4) যে মহান আত্মা এই সম্পূর্ণ জগৎকে আত্মার স্বরূপ ভাবে জানেন, সেই জ্ঞানী ব্যক্তি নিজের ইচ্ছা অনুসারে আচার-ব্যবহার করেন। তাকে কেউ বশীভূত করতে পারে না, অথবা চালিত করতে পারে না।

5) ব্রহ্মা থেকে শুরু করে ছোট্ট পিঁপড়া পর্যন্ত যে চার প্রকার জীবসমূহ রয়েছে, এদের সকলের মধ্যে একমাত্র জ্ঞানী ব্যক্তি ইচ্ছা এবং অনিচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সমর্থ হন।

6) আত্মা এবং ঈশ্বর এক। একে অদ্বৈত ভাবনা করা উচিত নয়। যিনি আত্মার মধ্যে ঈশ্বরকে দর্শন করেন, তাকে কোনদিন কোন প্রকার ভয় গ্রাস করতে পারে না, তিনি সর্বদা নির্ভয়ে থাকেন।

পঞ্চম প্রকরণ :-

আত্মজ্ঞানী পুরুষের জন্য সুখ এবং দুঃখ সমানভাবে প্রতীত হয়। আশা এবং নিরাশায় তাঁর মধ্যে কোন ভেদ তৈরি হয় না। জীবন মৃত্যু তাঁর জন্য অস্তিত্বহীন। অতএব এই অনুভূতির মধ্যেই আপনাকে লয় করে দিন।

1)ঋষি অষ্টাবক্র রাজা জনক কে বলেন, তোমার সাথে কারো সঙ্গ নেই, সেই জন্যই আপনি শুদ্ধ, তাহলে কাকে ত্যাগ করতে চাও? এইভাবে দেহাভিমানকে ত্যাগ করার ইচ্ছা করে, আপনি লয় কে প্রাপ্ত হও।

2) তোমার থেকেই সংসারের উৎপত্তি। যেমনভাবে সমুদ্র থেকে ফেনার সৃষ্টি হয়, সেইভাবেই তোমার থেকে এই সংসারের উৎপত্তি এইভাবে আত্মাকে এক মনে করে মোক্ষ প্রাপ্তি কর।

3) তোমার বিশুদ্ধ বোধ প্রাপ্তি হয়েছে, অতএব যাহা দৃশ্যমান জগৎ  তুমি দেখতে পাও, সেটা তোমার জন্য মিথ্যা। তুমি বিবর্তন থেকেও উপরে। অতএব পড়ে থাকা দড়ি কে সাপ বলে প্রতীত করো না। তুমি কেবল লয় কে প্রাপ্ত করো।

4) আত্মজ্ঞানী পুরুষের জন্য, যেমনটা তুমি হয়েছ, তাদের জন্য সুখ এবং দুঃখ সমান। আশা এবং নিরাশায় তাদের মধ্যে কোন ভেদ থাকে না। জীবন মৃত্যু তাদের জন্য অস্তিত্বহীন হয়ে যায়। অতএব এই অনুভূতিকে লয়হীন করে দাও।

ষষ্ঠ প্রকরণ :-

1)আমি সমস্ত চরাচরের মধ্যে ব্যাপ্ত এবং সমস্ত চরাচর আমার মধ্যেই সমাহিত। অতএব আমার জ্ঞান প্রাপ্ত হয়েছে যে আমি আমিই সব কিছু এবং সবকিছ আমার মধ্যেই স্থিত, অতএব আমি কাকে ত্যাগ করি এবং কাউকে গ্রহণ করি।

2)আমি সমুদ্রের মতো এবং এই সংসার ঢেউ এর মত। এটাই জ্ঞান। এজন্য না এর ত্যাগ করা দরকার, না গ্রহণ করা  দরকার। সময় এলে ইহা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিলীন হয়ে যাবে। 

3)আমি মোতির সমান বিশ্বের কল্পনা রুপোর সমান। এমনটা যেনো। অতএব না এর দেওয়া দরকার, না গ্রহণ করা দরকার। এর মৃত্যু আছে। 

4)নিশ্চিত রুপে আমি সকল জীবের মধ্যে আছি এবং এ সকল জীব আমার মধ্যেই বিদ্যমান। এটাই জেনে রাখো। এর জন্য  না দেওয়া দরকার না গ্রহণ দরকার। সময় হলে শত শুদ্ধভাবে এর বিনাশ হবে। 

 সপ্তম প্রকরণ :-

1)আমি এই অনন্ত মহাসমুদ্র। আমাতেই এই বিশ্ব তরঙ্গ রূপে সহজে উৎপন্ন হয় এবং সহজেই বিলীন হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ায় না আমার কোন লাভ হয়, না কোন হানি হয়। 2)আমি এই অনন্ত মহাসমুদ্র রূপে বিদ্যমান আমাতেই চিত্তরূপী বায়ু বিকারের কারণে বিশ্বরূপী নৌকা এদিক থেকে অধিক ভ্রমণ করে। এই ভ্রমণে আমার কোন প্রকারই কষ্ট হয় না। এটাই আমার সহিষ্ণুতা।

2)আমি রুপি এই অনন্ত মহাসমুদ্রে এই মহাবিশ্ব তরঙ্গের আকারে সহজেই উৎপন্ন হয়। এবং সহজেই বিলীন হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ার দ্বারা আমার কোন লাভ হয় না অথবা কোন হানি হয় না। 

3)আমি এই অনন্তরূপী মহাসমুদ্র। আমাতেই এই জগত কল্পনা মাত্র রূপে স্থিত। আমি পূর্ব রূপে শান্ত এবং নিরাকার এবং আশ্রয় রূপ। 

4)আত্মা কোন বিষয়ের মধ্যে নেই। আর বিষয় ওই অনন্ত এবং নিরঞ্জন আত্মার মধ্যে নেই। এইভাবে আমি অনাসক্ত। স্পৃহা মুক্ত। এবং এই অবস্থাতেই আমি সর্বদা স্থিত আছি। 

5)আমি চৈতন্য রূপে স্থিত। এই যে মহাবিশ্ব রয়েছে ইহা জটিল ইন্দ্রজাল এর মত অবস্থিত। এই মায়াজালে কিই বা সার্থক কি বা নিরর্থক, এর কল্পনা করারই প্রয়োজন নেই।

 অষ্টম প্রকরণ :-

যখনই আমিত্ব ভাব থাকেনা তখনই মোক্ষ লাভ হয়। যখন "আমি" এই ভাব থাকে তখন বন্ধন হয়। আত্মজ্ঞানী এটাই সত্য ভেবে ত্যাগ এবং গ্রহণের ইচ্ছা থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়া দরকার।

1)ঋষি অষ্টাবক্র বলেন যে যখন মনে ইচ্ছা বা অনিচ্ছার ভাব আসে, দুঃখ অথবা সুখ আসে, কিছু পাওয়ার জন্য বা কিছু হারানোর ইচ্ছা করা হয়, সম্মান পেলে মন  খুশি হয় অথবা অপমানে মন দুঃখিত হয়, তখনই বন্ধন আসে।

2)যখন মন না কিছু চায়, না কিছু ভাবে, না কিছু ত্যাগ করে, না কিছু গ্রহণ করে, যখন মন দুঃখীও হয় না সুখীও হয় না। তখনই তিনি মুক্ত। 

3)যখন মন কোন কিছুর প্রতি দৃষ্টি করে আছে বা কোন বিষয়ে আসক্ত হয়ে আছে, সেটাই বন্ধন। আবার মন যখন সকল দৃষ্টিতে অনাসক্ত হয়, তখন মুক্ত হয়ে যায়। 

4)যতক্ষণ "আমি" ভাব আছে, ততক্ষণ বন্ধন আছে। যখন "আমি"  ভাব নেই তখনই মুখ্য লাভ আছে। এই প্রকার ভেবে ইচ্ছা করো না, গ্রহণ করো না, ত্যাগ করো না, এসব থেকে মুক্ত থেকো।

নবম প্রকরণ :-

যে জ্ঞানী পুরুষ পঞ্চ ভূত এবং বিকারকে যথার্থ রূপে দেখতে পারেন অর্থাৎ তার নস্বরতার উপর বিশ্বাস করেন। তিনি তৎক্ষণাৎ বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যান।

  ঋষি অষ্টবক্র বলেন যে এই সংসারে এই দ্বন্দ্ব থেকে কে বাহির হতে পেরেছেন যে কি করার যোগ্য কি করার যোগ্য নয়। তুমি এ বিষয়ে বেশি ভাবনা করবে না এবং ত্যাগসম্পন্ন হয়ে বিরক্ত এবং ব্রতহীন হয়ে যাবে।

2) হে পিতঃ, তো সংসারের উৎপত্তি এবং বিনাশ এবং এর লোকাচরণ দেখে কোন মহান পুরুষই জীবন ভোগ এবং জ্ঞানের ইচ্ছা থেকে মুক্ত হতে পারে অর্থাৎ শান্ত হতে পারে।

3) এই বিশ্ব অনিত্য, ত্রিতাপ থেকে দূষিত, নিন্দ্রিত এবং ঘৃণাযোগ্য। যে জ্ঞানী এই কথাকে নিশ্চয়ই পূর্বক জানেন, তিনি পরম শান্তি প্রাপ্ত হন।

4) এই অনৈত্য বিশ্বের মধ্যে কোন সময়, কোন ক্ষণ, এমন নেই যখন ব্যক্তি দ্বন্দ্বের মধ্যে  ভেসে থাকে না। এই সত্যকে উপেক্ষা করতে করতেই যিনি প্রারুব্ধ থেকে প্রাপ্ত ভোগ কে শিরোধার্য করেন তিনি সিদ্ধ পুরুষ।

5) এই সংসার মধ্যে অনেক মহর্ষি যোগী এবং সাধু পুরুষ আছেন এবং তাঁদের সবারই আলাদা আলাদা মতবাদ এবং পন্থ রয়েছে। এই সত্যকে যিনি জানেন, দেখেছেন, তাঁদের মধ্যে এমন কে আছেন যিনি বিরক্তিপ্রাপ্তি করে শান্তচিত্ত হননি?

6) চৈতন্য স্বরূপকে জেনে যিনি ত্যাগ সমতা এবং বিবেক যুক্তির দ্বারা সংসার সাগর কে পার করে নিয়েছেন, সত্য অর্থে এমনই সমদ্রস্টা এবং ত্যাগী ব্যক্তি গুরু হন।

7) যে জ্ঞানী পুরুষ পঞ্চ ভূত এবং বিকারকে তার যথার্থ রূপে দেখতে পারেন অর্থাৎ এর নস্যরতায় বিশ্বাস করেন, তিনি তৎক্ষণাৎ সকল বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যান।

8) এই পৃথিবী সম্পূর্ণ বাসনাময়। এরকম নিশ্চয়ই করে বাসনা থেকে মুক্ত হয়ে বীকার রহিত হয়ে যান। বাসনাকে ত্যাগ করলেই এই মিথ্যা জগত এর ত্যাগ করা সম্ভব হয়। এরপরেই আপনি যথার্থ স্থিতি কে প্রাপ্তি করতে পারবেন।

দশম প্রকরণ :-

কত কত জন্ম থেকে আপনি তন, মন এবং বচন দিয়ে অনেক ভ্রমপূর্ণ কর্ম  করে এসেছেন, যাতে কোনদিন তৃপ্তি লাভ হয় নি।এবার এই সকল কর্ম কে ত্যাগ করে, উপসমতা কে হেতু করে এবং কর্ম থেকে বিরক্ত হয়ে, সুখী হন।

1)শত্রু স্বরূপ কাম বাসনাকে এবং অনর্থ যুক্ত অর্থকে ত্যাগ করে এবং ফল লাভের আশায় করা দান কে ত্যাগ করে, তুমি এসব কি অনাদর করো এবং উপেক্ষা করো।

2)মিত্র ক্ষেত ধন বাড়ি স্ত্রী ভাই এসব সম্পদ কি আপনি স্বপ্নের মত এবং ইন্দ্রজাল এর মত মনে করুন। এসব ক্ষণস্থায়ী থাকবে, চিরস্থায়ী নয়।

3)যেখানে যেখানে তৃষ্ণা আছে, সেটাই সংসার। প্রৌড়গণ বৈরাগ্য কে আশ্রয় করে, বীততৃষ্ণ হয়ে সুখী হয়ে যান।

4)তৃষ্ণা মাত্রই হলো আত্মার বন্ধন এবং তৃষ্ণার নাশ ই হলো মোক্ষ, সংসার মাত্র থেকে অনাসক্ত হলে নিরন্তরতা প্রাপ্তি এবং তুষ্টি প্রাপ্তি হয়।

5) তুমি হলে শুদ্ধ এবং চৈতন্য সংসার হল জড় এবং অসৎ। আবিদ্যা ও অসৎ।তাই এই আবিদ্যা কে জানার ইচ্ছা রেখে লাভ নেই।

6) এই জগতে মনুষ্যের নিকট ধন, ক্ষেত্র, সন্তান, পত্নী, দেহ এবং বৈভব সবকিছুই থাকে যার মধ্যে আসক্তি উৎপন্ন হয়। কিন্তু এসব জিনিষ বারবার আসে এবং বারবার নষ্ট হয়ে যায়। এইসব সবার জন্য ঘটে এবং তোমার সাথেও ঘটছে।

7) ধন এর আসক্তি থেকে, কামনা থেকে, শুভ কর্ম থেকে, এখন আর নেই এমন অনুভব হলেও মন কিন্তু স্থির থাকে না। সংসার এক জঙ্গল এর মত। মন কখনও চিন্তামুক্ত থাকে না। মনে শান্তি থাকে না, সবসময়ই গোলমাল লেগে থাকে। ভয় লেগে থাকে এবং ব্যাক্তি সর্বদা উদ্দিঘ্ন এবং চিন্তিত থাকেন।

8) কত জন্ম থেকে তুমি তোমার তন, মন এবং বচন দিয়ে অনেক ভ্রম পূর্ণ কর্ম করে আসছো, যাহাতে কোনদিন তৃপ্তি হয়নি। এবার এই কর্ম কে ত্যাগ করে, উপসমতার হেতু হয়ে যাও। এবং কর্ম থেকে বিরক্ত হয়ে সুখী হও।

একাদশ প্রকরণ :-

না আমি শরীর, না এই শরীর আমার। আমি তো বিশুদ্ধ বোধ। এরকম নিশ্চয় যুক্ত সৎ পুরুষ দেহ থাকতেও বিদেহী এবং কৃত-অকৃত কর্মের স্মরণ না করে, সকল আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্ত হয়ে যান।

1)ভাব এবং অভাব এর বিকার স্বভাব থেকে উৎপন্ন হয়, এটা যদি নিশ্চিত রূপে জানেন, তিনি নির্বিকার এবং ক্লেশ রহিত পুরুষ হয়ে, সুখ পূর্বক শান্তি কে উপলব্ধি করেন। 

2) সকলকে ঈশ্বরই সৃষ্টি করেছেন অন্য কেউ নয়, এমনটা যিনি নিশ্চয়ই পূর্বক জানেন, তিনি শান্ত থাকেন। তাঁর সকল আশা জড় থেকে নষ্ট হয়েছে। তিনি কোনদিন আসক্ত হন না।

3) বিপত্তি এবং সম্পত্তি জৈব যৌগেই সময়ে সময়ে আসে। এমন নিশ্চয়ই যুক্ত পুরুষ সর্বদা সন্তুষ্ট থাকেন। তিনি না কোন কামনা করেন, না কোন শোক করেন।

4) সুখ, দুঃখ, জন্ম, মৃত্যু, দৈবযোগের  দ্বারাই হয়। এমনটা যিনি নিশ্চিত ভাবে জানেন, তিনি সুখী এবং শান্ত থাকেন। তাঁর স্পৃহা সর্বদা নষ্ট থাকে এবং তিনি চিন্তা মুক্ত থাকেন।

5) আমি দেহ নয়, এই দেহ আমার নয়, আমি বোধ স্বরূপ, এমনটা যদি নিশ্চিত ভাবে জানেন, তিনি কৈবল্য প্রাপ্তি হয়ে কৃত এবং অকৃত কর্ম কে স্মরণ করেন না।

6) ব্রহ্ম থেকে শুরু করে তৃণ পর্যন্ত সবকিছুই "আমি" । এমনটা যিনি নিশ্চয়ই পূর্বক জানেন, তিনি নির্বিকার, শুদ্ধ এবং শান্ত। তিনি প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি থেকে সদা নিবৃত থাকেন।

7) এই বহু আশ্চর্যযুক্ত মহাবিশ্ব বাস্তবের কিছুই নয় অর্থাৎ মিথ্যা। এমনটা যিনি নিশ্চিত রূপে জানেন, তিনি বাসনা রহিত হয়ে, বোধ স্বরূপ পুরুষ  হয়ে, শান্তিকে উপলব্ধি করেন। এটা নিশ্চিত জানুন যে এই জগৎ মিথ্যা, সত্যি নয়।

 দ্বাদশ প্রকরণ :-

যেমনভাবে অজ্ঞানতার কারণে ব্যক্তি কর্মের প্রতি আসক্ত হন,ঠিক তেমনিভাবে অজ্ঞানতার কারণেই ব্যক্তি কর্ম বিমুখও হন। আমি এই দুই তত্ত্বকেই ভালোভাবে জেনে দুই তত্মেরই উপরে কর্ম ও অকর্ম থেকে মুক্ত হয়ে, আত্মস্থিত আছে।

1) রাজা জনক বলেন যে সব থেকে প্রথমে আমি সকল শারীরিক ক্রিয়ার পরিত্যাগ করলাম। তারপর বাণীবিরাম এ সিদ্ধহস্ত হলাম। তারপর সব চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে আমি সবার মধ্যে স্থিত হয়েছি। 

2) আমার জন্য শব্দাদি বিষয় অসার হয়ে গেছে, আত্মদর্শন থেকে আমার চঞ্চল চিত্ত ভ্রম এবং বিক্ষেপকে ত্যাগ করে ফেলেছে। আর এখন আমি শুদ্ধবোধ হয়ে আত্মার মধ্যে স্থিত হয়ে গেছি।

3) সার্থক-নিরর্থক থেকে নিস্প্রিহ, শোক বিষাদ থেকে মুক্ত হয়ে আমি এই মিথ্যা জগত এর বাস্তবিত বাস্তবিক রূপ কে জেনে গেছি। এখন আমি নিরপেক্ষ নিরঞ্জন এবং নির্বিকার হয়ে আত্মস্বরূপে স্থিত হয়ে গেছি।

4) চার আশ্রমের কর্তব্য ও কর্তব্য কে জেনে, বিবিধ বিচার, ধ্যান এবং চঞ্চল চিত্তের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে লক্ষ্য করে আমি এতে পূর্বের মতো বিমুক্ত হয়ে গেছি। এবং আত্মার মধ্যে স্থিত হয়ে গেছি।

5) যেমনভাবে কোন ব্যক্তি অজ্ঞানতার কারণে কর্মের প্রতি আসক্ত হন, তেমনি ভাবে অজ্ঞানের কারণেই ব্যক্তি কর্ম বিমুখও হন। আমি এই দুই তত্ত্বকে ভালো করে জেনে দুই তত্ত্ব থেকেই উপরে ওঠে, কর্ম ও কর্ম থেকে মুক্ত হয়ে, আত্মার মধ্যে স্থিত হয়েছি।

6) জিনি মন এবং বুদ্ধির দ্বারা চিন্তন করেন না, সেই অচিন্ত্যের চিন্তা করাটাও অজ্ঞানতা। আমি সেই অচিন্ত্যকে এবং চিন্তার ভাবনাকে ত্যাগ করে, শুদ্ধবোধ হয়ে, আত্মস্থিত হয়েছি।

7) এইভাবে যিনি আত্মস্থিত হয়ে গেছেন, তিনি কৃতার্থ হয়ে গেছেন এবং যাঁর এমনই স্বভাব প্রাপ্ত আছে সেই পুরুষ ও কৃতার্থ হয়ে যান। অর্থাৎ তাঁকে আর কিছু করার প্রয়োজন থাকে না, তিনি মুক্ত হয়ে যান।

 ত্রয়োদশ প্রকরণ :-

 1)আকিঞ্চন ভাব থেকে উৎপন্ন স্বচিত্তে স্থির স্থিতি যুক্ত পুরুষ যিনি গেরুয়া ধারণ করেন তাঁর মধ্যেও সম্পূর্ণতা ভাবনা দুর্লভ হয়। অর্থাৎ তিনিও আসক্তি থেকে পূর্ণ মুক্ত  হতে পারেন না। আমি সব আসক্তি পরিত্যাগ করে দিয়েছি এবং আমি পরম সুখে স্থিত হয়ে গেছি।

2)দুঃখ যেকোনো জায়গায় হতে, পারে কখনো শরীরের দ্বারা, কখনো কথার মাধ্যমে, আবার কখনো মনের মাধ্যমে, আমি এই তিন রকমই সম্বন্ধকে বিচ্ছেদ করে নিয়েছি। অতএব আমি পরম পুরুষার্থ রূপে সুখ ভাবে নিশ্চিত আছি।

3) কোন ব্যক্তি যা করেন, বা তিনি যা হন, সেটা কোন প্রকারেই আত্মা সম্বন্ধিত বিষয় নয়। আমি এই সত্যকে জেনে এবং যে সুকৃত আছে তাকে করতে করতে পরম সুখে স্থিত আছি।

চতুর্দশ প্রকরণ :-

জীবাত্মা, আত্মা এবং পরমাত্মা এই তিনের স্বরূপ সত্যকে জেনে নেওয়ার পর মুখ্য এবং বন্ধনের প্রতি পূর্ণরূপে বৈরাগ্যবান হয়ে গেছি। এখন আমার মুক্তি প্রাপ্তির কোন চিন্তা নেই।

1) যিনি স্বভাব থেকে শূন্য চিত্ত এবং বিষয় ভাবনাকে পাগলের মত দেখেন, তিনি ঘুমন্ত অবস্থাতেও জাগ্রত সমান। সেই পুরুষ সংসারে থেকেও সংসার থেকে সদা মুক্ত আছেন।

2) কোথায় সম্পত্তি, কোথায় মিত্র, কোথায় বিষয় বাসনা রুপী চোর, কোথায় শাস্ত্র এবং কোথায় বিজ্ঞান, যখন আমার সব ইচ্ছাই গলে নষ্ট হয়ে গেছে, তখন আবার এসবের সাথে আমার সম্বন্ধ কি?

3)জীবাত্মা আত্মা এবং পরমাত্মা এই দিনে স্বরূপ সত্য জেনে যাওয়ার পর মুখ্য এবং বন্ধনের প্রতি পূর্ণরূপ থেকে বৈরাগ্যবান হয়ে গেছি, আর আমাকে মুক্তিরও চিন্তা করার প্রয়োজন নেই।

পঞ্চদশ প্রকরণ :-

1)ঋষি অষ্টবক্র বলেন সৎ বুদ্ধিযুক্ত পুরুষ অল্প উপদেশ পেয়ে কৃতার্থ হন এবং অসৎ বুদ্ধিযুক্ত পুরুষ আজীবন জিজ্ঞাসা করেও তাতে মোহগ্রস্ত থাকেন। 

2)বিষয় থেকে অনাসক্ত থাকাই হলো মোক্ষ,বিষয়ের রস পেলে তা হল বন্ধন, এতটুকুই বিজ্ঞান। এবার তুমি যা চাও তাই কর।

3)তুমি এই শরীর নও, ইহা তোমার শরীর নয়, তুমি ভোক্তা ও নও , কর্তাও নও। তুমি সেই চৈতন্য স্বরূপ, নিত্য সাক্ষী এবং নিরপেক্ষ। অতএব তুমি সুখপূর্বক বিচরণ করো।

4)রাগ এবং দ্বেষ হলো মনের ধর্ম, তুমি কখনো মন নও, তুমি নির্বিকল্প, নিরাকার, বোধস্বরূপ আত্মা, অতএব তুমি সুখপূর্বক বিচরণ কর।

5) সব ভূতে আত্মা জেনে, তথা সব ভূতে আত্মা মেনে, তুমি অহংকার রহিত এবং মমতা রহিত হয়ে যাও।

6)যার মধ্যে এই সংসার তরঙ্গের মতো স্ফুরিত হয় সেটা তুমি নিজেই, এতে সন্দেহ নেই সেটা চৈতন্যস্বরূপ তুমিই, তাই তুমি সন্তাপ রহিত থাকো।

7)তুমি মোহ করো না, তুমি জ্ঞানস্বরূপ, ভগবানস্বরূপ আত্মা, তথা প্রকৃতির থেকেও আগে।

8)গুণলিপ্ত এই শরীর আসে আর যায়। কিন্তু আত্মা না আসে, না যায়, তাই এর জন্য ভাবনা কি শোকই বা কিসের?

9)এই শরীর এখনই চলে যাক অথবা শেষ পর্যন্ত থাকুক, তুমি চৈতন্য স্বরূপের বৃদ্ধিও নেই শেষও নেই।

10)তুমি অনন্ত মহাসমুদ্রের মধ্যে বিশ্বরূপ তরঙ্গ স্বরূপ। স্বভাবতই তোমার উদয় এবং অস্ত হয়, কিন্তু তোমার বৃদ্ধিও নেই নাশও নেই।

11)তুমি চৈতন্য স্বরূপ, তোমার এই জগত তোমার থেকে ভিন্ন নয়, এই জন্য হেয় এবং উপদেয় এর কল্পনা করে কি হবে? 

12) তুমি এক নির্মল, অবিনাশী এবং চৈতন্য স্বরূপ আকাশ। অতএব এতে তোমার কোথায় জন্ম? কোথায় কর্ম? কোথায় অহংকার?

13)যাকে তুমি দেখতে পাও, তার মধ্যেও তুমিই ভেসে আছো।সোনার হার,সোনার বালা এবং সোনার নুপুর এই তিনটি কি সোনা থেকে আলাদা?

14)এখানে আমি আছি, এখানে আমি নেই, এই বিভাগকে ছেড়ে দাও। সবকিছুই আত্মা, এমন নিশ্চয়ই করে তুমি সংকল্প রহিত হয়ে সুখী হও।

15)তোমার অজ্ঞানতা থেকেই বিশ্বের অস্তিত্বের সৃষ্টি। তুমি এবং এই বিশ্ব সৃষ্টি এক,আলাদা কিছু নেই। তোমার ছাড়া অন্য কিছুই এখানে নেই। না সংসারী, না অসংসারী, অন্য কেউ নেই।

16)এইযে মহাবিশ্ব দেখা যায়, সেটা ভ্রম ছাড়া কিছুই নয়। এমনটা নিশ্চয়ই পূর্বক জানো এবং কলা তথা বাসনা রহিত হও এবং চৈতন্য মাত্র হয়ে থেকে যাও।

17)এই সংসার রূপী মহাসমুদ্রে তুমি এক, একই ছিলে এবং একই থাকবে। তোমার বন্ধন ও মুক্তি নেই। তুমি কৃতকৃত্য হয়ে সুখপূর্বক বিচরণ করো।

18)হে চিন্ময়, তুমি সংকল্প এবং বিকল্পে ক্ষোভ করো না। শান্ত হয়ে, আনন্দপুরিত হয়ে, থেকে নিজের মধ্যে, নিজরূপে সুখ-পূর্বক স্থিত হও।

19)সর্বত্র ধ্যানকে ত্যাগ করো কোন কিছুই ধ্যান করো না। তুমি আত্মা, তুমি মুক্ত। তুমি বিমর্ষ হয়ে কি করবে? 

20)এই কাজটা করা হয়ে গেছে, এই কাজটা করতে বাকি আছে, এরকম মানসিক দ্বন্দ্ব থেকে মন যখন মুক্ত হয়ে যায়, তখন সে ব্যক্তি ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষের প্রতি উদাসীন হয়ে যায়।

21)এই সংসার সমুদ্রের মধ্যে তরঙ্গের যেমন সৃষ্টি হয় তেমনি ভাবে সৃষ্টি হয়েছে, আবার সমুদ্রের তরঙ্গের যেমন লয় হয় তেমনি লয় হবে, তাই সংসারের প্রতি কোনো মোহ রেখো না। তোমার মুক্তির দরকার নেই, তুমি আগে থেকেই মুক্ত।

22)যতক্ষণ স্পৃহা জীবিত আছে -যেটা হলো একা অবিবেক দশা,ততক্ষণ হেয় এবং উপাদেয় দুটোই জীবিত থাকবে এবং সেটাই হলো এই সংসার রূপী বৃক্ষের অঙ্কুর।

23)প্রবৃত্তি থেকে রাগ উৎপন্ন হয় এবং নিবৃত্তি থেকে দ্বেষ উৎপন্ন হয়। এই জন্য বুদ্ধিমান পুরুষ দ্বন্দ্ব মুক্ত থেকে বালকের মতো ভাবে থাকেন। 

24)রাগী পুরুষ দুঃখ থেকে বাঁচার জন্য সংসারকে ত্যাগ করতে চান। কিন্তু বীতরাগী পুরুষ দুঃখ মুক্ত হয়ে সংসারের মধ্যেও ক্ষোভ রাগ ইত্যাদি বিকারকে প্রাপ্ত হন না।

25)যাঁর মোক্ষের প্রতি অহংকার আছে এবং তেমনি শরীরের প্রতি মমতা আছে, তিনি না তো যোগী হন, না জ্ঞানী হন। তিনি কেবল দুঃখের ভাগী হন।

সপ্তদশ প্রকরণ :-

1)যে ব্যক্তি মানসিকভাবে তৃপ্ত থাকেন, শুদ্ধ ইন্দ্রিয় যুক্ত এবং সদা একাকী রমন করেন, তেমন ব্যক্তিকেই জ্ঞান এবং যোগ অভ্যাস প্রাপ্ত হয়।

 2)যিনি পরম তত্ত্ববেত্বা পুরুষ তিনি সংসারে সমস্ত বিষয়ের মধ্যে বিচরণ করতে থাকলেও কোন প্রকারই দুঃখ গ্রস্থ হন না। কারণ তিনি এই সত্যকে ভালোভাবেই জানেন যে এইসব ব্রহ্মাণ্ড তাঁর দ্বারাই পূর্ণরূপে পূর্ণতা প্রাপ্ত অর্থাৎ তিনি স্বয়ং এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে ব্যপ্ত।

3)এই সংসারে ভোগ বিষয়ে লিপ্ত থাকা ব্যক্তিও মোক্ষ লাভের আকাঙ্ক্ষা রাখেন। এমন মহাপুরুষ খুব কমই পাওয়া যায়, যিনি না ভোগের ইচ্ছা রাখেন, আর না মোক্ষের ইচ্ছা রাখেন অর্থাৎ যিনি পূর্ণরূপে নিরাকাঙ্খী।

4)তিনি নিশ্চয়ই উদার চরিত্রের ব্যক্তি হবেন যিনি ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষা,জীবন এবং মৃত্যু এই সকল বিষয়ের প্রতি হেয় ভাব রাখেন না , অথবা উপাদেয় ভাব রাখেন না, তিনি সম্পূর্ণ নিরাকাঙ্খী থাকেন।

5)মুক্ত পুরুষ সর্বদা স্বস্থ, সর্বত্র বিমল, এবং আশয়যুক্ত ভাবে দেখা দেন। এবং তিনি স্ববাসনা রহিত হয়ে সর্বত্র সুশোভিত হন।

6)যে ব্যক্তি দেখেন, শ্রবণ করেন, স্পর্শ করেন, ঘ্রাণ নেন, খাবার খান, গ্রহণ করেন, কথা বলেন, চলাফেরা করেন, সবকিছুই করেন, অথচ হিত এবং অহিত ভাব থেকে মুক্ত থাকেন, সেই পুরুষ নিশ্চিতভাবে জীবন মুক্ত পুরুষ।

7)মুক্তপুরুষ সর্বত্র রস রহিত  থাকেন। তিনি কারও নিন্দা করেন না, কারও স্তুতি করেন না । তিনি আনন্দিত হন না, তিনি ক্রুদ্ধও হন না, তিনি দান করেন না, আবার তিনি গ্রহণও করেন না।

8)প্রীতিযুক্ত স্ত্রী এবং সম্মুখে উপস্থিত মৃত্যুকে দেখে যে মহাশয় অবিচলমনা থাকেন এবং স্বস্থ থাকেন, তিনি নিশ্চয়ই মুক্ত। 

9)সমদর্শী ব্যক্তির মনে সুখ এবং দুঃখের মধ্যে, নর এবং নারীর মধ্যে, সম্পত্তি এবং বিপত্তির মধ্যে, কোন ভেদ থাকে না।

10)যে ব্যক্তির জন্য এই সংসার জগৎটাই ক্ষীন হয়ে গেছে, এমন ব্যক্তির মধ্যে হিংসাও থাকে না, করুণা ও থাকে না, উদ্যন্ততাও থাকে না, দরিদ্রতা ও থাকে না, আশ্চর্য ও থাকে না, ক্ষোভও থাকে না।

11)মুক্ত পুরুষ কোন বিষয়বস্তুতে দ্বেষ করেন না, তাঁর কোন বিষয়ে আসক্তি থাকে না, তিনি সদা আসক্তি রহিত এবং মন মুক্ত হয়ে প্রাপ্ত এবং অপ্রাপ্ত উভয় বস্তুকে উপভোগ করেন।

12)যাঁর আশা আকাঙ্ক্ষা ভিতর থেকে গলিত হয়েছে, যিনি নিশ্চয়ই পূর্বক জানেন যে ..বাস্তবে কোন কিছুরই অস্তিত্ব নেই। এমন মমতা রহিত অহংকারশূন্য পুরুষ কর্ম করতে করতেও কর্মে লিপ্ত হন না।

13)যার মন গলিত হয়ে গেছে, যার মনে কর্ম মোহ, স্বপ্ন এবং জড়তা, সব সমাপ্ত হয়ে গেছে, সেই পুরুষই কেবল অনির্বচনীয় অবস্থা প্রাপ্ত হন।

অষ্টাদশ প্রকরণ :-

1)বিপুল ধনসম্পত্তি অর্জন করে বিষয়বস্তু প্রাপ্তি করা যায়, কিন্তু আসল সুখ কখনো পাওয়া যায় না। পূর্ণ সুখ তো সর্বশেষ সবকিছু ত্যাগ করলে তখনই পাওয়া যায়।

2)এই জগৎ হল কল্পনা মাত্র পারমার্থে গ্রুপে দেখা গেলে বাস্তবে এর অস্তিত্ব নেই।

3)যিনি নির্বিকল্প, নিস্প্রয়াস, নিরপেক্ষ, নিরঞ্জন এবং নির্বিকার হয়ে গেছেন, তাঁর জন্য আত্ম- পদ বেশি দূর নেই। এমন সৎ পুরুষের জন্য আত্ম-পদ সর্বত্র সহজভাবে উপলব্ধ হয়।

4)এই সমস্ত জগৎ কল্পনা মাত্র এবং আত্মা মুক্ত ও সনাতন। 

5)আত্মাই হলো ব্রহ্ম এবং ভাব এবং অভাব হল কল্পিত। ইহা নিশ্চয়পূর্বক জেনে নিষ্কাম পুরুষ কর্ম হীন হয়ে যান।

6)নির্বিকল্প স্বভাব যুক্ত যোগীর জন্য রাজ্য এবং ভিক্ষাবৃত্তিতে, লাভ এবং হানি তে, সমাজে এবং বনে,- কোন পার্থক্য থাকে না।

7)জীবন মুক্ত যোগীর জন্য কর্তব্যকর্ম বলে কিছুই থাকে না। তার  হৃদয়ে কোন অনুরাগ নেই। তিনি সংসারে যথা প্রাপ্ত জীবন অতিবাহিত করেন।

8) আত্ম জ্ঞানী পুরুষ তৃপ্ত থাকেন, ভাব-অভাব রহিত এবং বাসনা রহিত থাকেন, তিনি লোক দৃষ্টিতে কর্ম করলেও বাস্তবে কিছুই করেন না।

9)তত্ত্ব জ্ঞান অর্জন দ্বারা ধৈর্য্যতা প্রাপ্ত সত্য পুরুষের মধ্যে প্রবৃত্তি বা নিবৃত্তির প্রতি কোন আগ্রহ থাকে না, তাঁর সমক্ষে যে কার্যই হোক তিনি সেই কার্যকে সহজভাবে করেন এবং পরম সুখে সর্বদা স্থির থাকেন।

10)বিষয় রহিত, আশ্রয় রহিত, স্বচ্ছন্দ এবং সব বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া হয়ে যাওয়া আত্মজ্ঞানী সংসাররূপী বায়ুতে শুকনো পাতার মত ব্যবহার করেন। অর্থাৎ তিনি নিজেকে ওই বায়ুর আশ্রয়ে ছেড়ে দেন।

11)সংসার মুক্ত পুরুষকে কর্ম হর্ষিত করতে পারেনা, বিষাদিতও  করতে পারে না। তিনি শান্ত মনে সদা বিদেহীর মতো শোভায়মান হন।

12)আত্মাতে রমন কারী এবং শীতল ও নির্মল যুক্ত ধীরপুরুষের কোন ত্যাগ করার ইচ্ছা থাকে না, বা কোন কিছু গ্রহণ করার ইচ্ছা থাকে না।

13)স্বাভাবিক রূপে যিনি শূন্যচিত্ত এবং যিনি সহজ রূপে কর্ম করেন, সেই ধীর পুরুষ এর সামান্য জনের মত মান ও থাকে না, অপমান ও থাকে না।

14)এই কর্ম শরীর দ্বারা কৃত, আমার শুদ্ধ স্বরূপ দ্বারা নয়। এরকম চিন্তন কে যিনি অনুগমন করেন, তিনি কর্ম করলেও কর্ম করেন না।

15)মহাশয় পুরুষ বিক্ষেপ রহিত এবং সমাধি রহিত হওয়ার কারণে তিনি মুমুক্ষু থাকেন। তিনি নিশ্চিত রূপে সংসার কে কল্পিত রূপ দেখে ব্রহ্মবৎ থাকেন।

16)যার অন্তঃকরণে অহংকার আছে, তিনি কর্ম না করেও কর্ম করেন এবং অহংকার রহিত বীরপুরুষ কর্ম করেও কর্ম করেন না।

17)মুক্ত পুরুষের মধ্যে উদ্যোগ রহিত, সন্তোষ রহিত কর্তব্য রহিত, স্পন্দন রহিত, আশা রহিত, সন্দেহ রহিত মনই শোভাপায়।

18)মুক্ত পুরুষের মন ধ্যান বা চেষ্টায় প্রবৃত্ত থাকে না, তিনি হেতু ছাড়া ধ্যান করেন এবং কর্ম করেন।

19)অজ্ঞানী মন একাগ্রতা অথবা নিরোধ প্রাপ্ত করার জন্য অনেক অভ্যাস করেন। কিন্তু জ্ঞানী পুরুষ ঘুমন্ত ব্যক্তির মত নিজ স্বভাবে স্থির থেকে থাকেন। এরা কোন কর্তব্য যোগ দেখেন না।

20)অজ্ঞানী পুরুষ প্রলয় অথবা অপ্রলয়ে নিবৃত্তি প্রাপ্ত করতে পারেন না। জ্ঞানী পুরুষ কেবল তত্ত্বকে নিশ্চিত রূপে জেনে, সদা নিবৃত থাকেন।

21)জিনি অজ্ঞানী অভ্যাসকে মহত্ব দেন, তিনি শুদ্ধ, বুদ্ধ,প্রিয়, প্রপঞ্চ রহিত, পূর্ণ এবং নিরাময় আত্মাকে কোনদিন জানতে পারেন না।

22)অজ্ঞানী পুরুষেরা অভ্যাসরূপী কর্মে লিপ্ত থেকে মোক্ষলাভ করেন না। ক্রিয়া রহিত জ্ঞানী পুরুষ কেবল জ্ঞান দ্বারা মুক্ত হয়ে স্থির থাকেন।

23)বিবেকহীন ব্যক্তি ব্রহ্ম হওয়ার ইচ্ছা তো প্রকাশ করেন, কিন্তু কোনদিন প্রাপ্ত হন না। তত্ত্ব জ্ঞানী ব্যক্তি ইচ্ছা না করেও সরল ভাবেই ব্রহ্মস্বরূপ প্রাপ্তি লাভ করেন।

24)অজ্ঞানী পুরুষেরাই হলেন এই আধার রহিত দূরাগ্রহ যুক্ত সংসারের পোষক। এই অনর্থের মূল যুক্ত সংসারের মূলচ্ছেদ জ্ঞানী ব্যক্তি দ্বারাই করা হয়েছে।

25)অজ্ঞানী ব্যক্তি যে উপায়, প্রয়াস এবং অভ্যাসের দ্বারা শান্তিকে প্রাপ্ত করার চেষ্টা করেন তাতে কোনদিন শান্তি প্রাপ্ত হয় না।আত্মজ্ঞানী তত্ত্বকে জেনে নিশ্চয়ই থেকে পরম শান্তিকে প্রাপ্তি লাভ করেন।

26)যিনি দৃশ্যমানকে অবলম্বন করেন তার আত্মদর্শন হয় না। ধীরপুরুষ দৃশ্যমানকে দেখেন না, তিনি অবিনাশী আত্মাকে দেখেন।

27)অজ্ঞানী ব্যক্তি বলপূর্বক মনের মধ্যে অঙ্কুশ লাগানোর নিষ্ফল চেষ্টা করেন, এতে মন বশীভূত হয় না। নিজের মধ্যে  রমনকারী জ্ঞানী পুরুষ  কোন প্রয়াস এর মাধ্যম ছাড়াই সহজ রূপে চিত্তবৃত্তি নিরোধ করে নেন।

28)যাঁর বুদ্ধি কম, অথবা বুদ্ধি নেই, এমন অজ্ঞানি ব্যক্তি অদ্বৈত রূপে আত্মাকে মানার ইচ্ছা রাখেন। কিন্তু মোহ এর কারনে সত্যস্বরূপ জানতে পারেন না, এই কারণেই সারা জীবন অসন্তুষ্টিতে ভোগেন।

29)মুমুক্ষু পুরুষ বুদ্ধি অবলম্বন ছাড়া থাকতে পারেন না। মুক্ত পুরুষের বুদ্ধি পুরুষের বুদ্ধি সদা নিষ্কাম এবং নিরালম্ব থাকে।

30)বিষয়রূপী বাঘ দেখে ভয় ভীত হওয়া মানুষ স্মরণের খোঁজে যান এবং অসমর্থ হয়ে চাটুকারের মত তার সেবা করতে থাকেন।

31)বাসনা রহিতপুরুষ সিংহকে দেখে বিষয় রুপি হাতি চুপচাপ পালিয়ে যায়, অসমর্থক হয়ে চাটুকারের মতো তার সেবা করে।

32)তত্ব জ্ঞানী পুরুষ শঙ্কা  রহিত  এবং মুক্তমনের হন, সেই জন্য তাঁরা মুক্তির জন্য কোন অভ্যাস কর্ম করেন না, তাঁরা তো নিজের সকল জ্ঞানেন্দ্রিয় কে ব্যবহার করে তাতে নির্লিপ্ত হয়ে পরম সুখে স্থির থাকেন।

33)যে ব্যক্তির শ্রবণ মাত্রই পরম সত্যকে জ্ঞাত হয়ে যান। এমন তথ্য জ্ঞানী পুরুষ অবিকল এবং শুদ্ধবুদ্ধ হয়ে আচার-অনাচার এবং উদাসীনতা থেকে দূরে থাকেন।

34)আত্মজ্ঞানী পুরুষ শিশু বধ থাকেন। অবোধ শিশু যেমন নিজের দৈহিক কর্ম, প্রকৃত রূপে থেকে সহজ ভাবে করেন, এবং কোন প্রকার আগ্রহ করেন না। তেমনিভাবে আত্মজ্ঞানী পুরুষ ও  যে কোন ভাবে শুভ অশুভ আসুক তাকে সহজভাবে করেন।

35)যিনি আত্মাকে জেনে স্বতন্ত্র হয়ে যান, এমন ব্যক্তি সর্বশুলভ হন। আত্মস্বতন্ত্র ব্যক্তির সুখ জ্ঞান এবং পরম পদের সহজেই প্রাপ্তি হয়।

36)যখন কোন ব্যক্তির নিজের আত্মা কে অকর্তা এবং অভক্তা ভেবে নিশ্চয় হয়ে যান, তখন তাঁর চিত্রবৃত্তি সহজভাবেই সমাপ্ত হয়ে যায়।

37)আত্ম জ্ঞানী ব্যক্তির সহজ চঞ্চলতা ভাবও শোভায়মান হয়। কিন্তু বিষয় আসক্ত বিবেকহীন ব্যক্তির শান্তিভাব ও শোভিত হয় না।

38)সকল প্রকার কল্পনার থেকে মুক্ত হয়ে সকল প্রকার বন্ধন ভেঙে দিয়ে আত্মজ্ঞানী পুরুষ না কোন মহা ভোগের আনন্দ নেন, আর না কোন গুফা পর্বতে গিয়ে বিরাজ করেন, কোনটাই করেন না।

39)শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ, দেবতা এবং দেবস্থান, অনিধ্য সুন্দর স্ত্রী, রাজা এবং রাজপথ অথবা অতি প্রিয় কোন ব্যক্তিকে দেখেও জ্ঞানী পুরুষের কোন কামনা বা বাসনা আসে না।

40)যিনি আত্মজ্ঞানী পুরুষ হন, তিনি নিকট সম্বন্ধী,সেবক, পুত্র ,কন্যা, পত্নী, প্রপৌত্র, এদের থেকে দুর্ব্যবহার পেলেও বা তাঁকে কেউ উপহাস করলেও, তিনি ক্লান্ত বা অশান্ত হন না।

41)যিনি আত্মজ্ঞান পেয়েছেন, তিনি সন্তুষ্ট হয়েও সন্তুষ্ট থাকেন না। দুঃখী হয়েও দুঃখী হন না। তাঁর আশ্চর্যময় দশা কে শুধুমাত্র  আত্মজ্ঞানীই বুঝতে পারেন।

42)এই সংসার কর্তব্য দারা সঞ্চালিত হয়, এই সত্যকে নিশ্চয়ই করে শুন্যাকার, নিরাকার, নির্বিকার এবং নিরাময় আত্মজ্ঞানী এই সংসার কে কোন মহত্বই দেন না।

43)আত্মজ্ঞানী কর্মরত হন অর্থাৎ বসেন, ঘুমান, কাজ করেন, আসা যাওয়া করেন, তবুও তিনি সুখে থাকেন এবং তার ব্যবহার পরম শান্ত থাকে।

44)তত্বজ্ঞানী পুরুষ সহজে রূপেই এই জগতে ব্যবহার রত থাকেন। এবং লেশ মাত্রও দুখের অনুভব করেন না। যেমন মহাসাগর কোন ক্ষোভ ছাড়াই এবং কোন ক্লেশ ছাড়াই শোভায়মান থাকে।

45)অজ্ঞানী যদি নিবৃতিরত থাকেন তবুও তাঁকে প্রবৃত্তিপূর্ণ ভেবে নিন। অথচ  আত্মজ্ঞানী যদি প্রবৃত্ত থাকেন, তবু তাকে নিবৃতের সমান ফলদায়ী ভেবে নিতে হবে।

46)অজ্ঞানী যদি বৈরাগ্যের কথাও বলেন, তাঁর  ঘর পরিবারের প্রতি মোহ নেই, তবুও তিনি বৈরাগী হতে পারেন না। কিন্তু যিনি দেহ অভিমান ছেড়ে দিয়েছেন, এমন তত্বজ্ঞানী পুরুষের মনে না রাগ থাকে, না বৈরাগ্য থাকে, তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত থাকেন।

47)অজ্ঞানী সর্বদা ভাবনা ও অভাবনা এর মধ্যে আসক্ত থাকেন। অন্যদিকে আত্মজ্ঞানী পুরুষ সুস্থ চিত্ত হয়ে ভাবনা এবং  অভাবনা থেকে মুক্ত থাকেন।

48)আত্মজ্ঞানী পুরুষ সর্বদা শিশুর মত ভাবনা নিয়ে সহজেই কর্ম আরম্ভ করেন এবং  সম্পাদিত করেন। এমন শুদ্ধচিত্ত ভাবে কর্ম করা ব্যক্তি ওই কর্মে কোনদিন সংলিপ্ত হন না।

49)যে ব্যক্তি প্রত্যক্ষ এবং প্রত্যক্ষভাবে কোন ফলের কামনা রাখেন না, তিনি প্রয়োজন রহিত থাকেন, সেই নিঃস্বার্থ সন্ন্যাসী নিজে আত্মস্বরূপ প্রাপ্ত করে, বিজেতার মত সহজে সমাধিস্থত হয়ে যান।

50)যিনি তত্ত্বকে জেনে নিলেন, তিনি ভোগ এবং মোক্ষের আকাঙ্ক্ষা রাখেন না। তাঁর মধ্যে কোন প্রকার রাগ অথবা দ্বেষ  উৎপন্ন হয় না। এমন তত্ব জ্ঞানীর জন্য বিষয় ভোগ নিয়ে বলার কিছুই থাকে না।

51)দ্বৈত সংসারের মহত্ব এবং সার্থকতা নাম মাত্রই থাকে, এটাই জেনে তত্ত্ববোধযুক্ত সৎ পুরুষ শুদ্ধ স্বরূপ এ স্থিত হয়ে নিস্কাম হয়ে যান। অর্থাৎ তাঁর জন্য করার যোগ্য কিছুই বাকি থাকে না।

52)যে জ্ঞানী ব্যক্তি ইহা নিশ্চয়ই করে নিলেন যে.. সকল ভ্রম এবং ভ্রান্তি অস্তিত্বহীন, তিনি লক্ষ্যবিহীন স্ফূর্ত, এবং বিশুদ্ধ স্বভাবযুক্ত হয়ে, শীঘ্রই পরম শান্তির সিদ্ধি লাভ করেন।

53)যিনি নিজে শুদ্ধ স্বরূপের স্ফুরনাকে অনুভব করে নিয়েছেন,তিনি আর দৃশ্যমান জগতকে দেখেও দেখেন না। তাঁর জন্য কোন কর্মবিধি অথবা কোন বৈরাগ্য নেই। কোথায় বা শান্তি? এবং কোথায় ত্যাগ ? জ্ঞানী ব্যক্তি এইসব  এর থেকেও উপরে স্থিত হয়ে যান।

54)যে আত্মজ্ঞানী নিজের শুদ্ধ বুদ্ধির দ্বারা এই জগতকে শুধুমাত্র মায়াজনিত এবং কল্পিত অনুভব করেন, এমন আত্মজ্ঞানী মোহমুক্ত, অহংকার রহিত, তথা নিষ্কাম ভাবে নিজের মধ্যে সুশোভিত থাকেন।

55)আত্মজ্ঞানী পুরুষ নিজেও স্বরূপকে সো আত্মার অনস্বর এবং সন্তাপ রহিত রূপে দেখেন। এই জন্য তাঁর জন্য কোথায় জ্ঞান, কোথায় জগত, কোথায় দেহ এবং কোথায় তিনি নিজে?

56)আত্ম অজ্ঞানী একদিকে তো মুক্তির জন্য চিত্ত বৃত্তিকে বন্ধ করার জন্য অভ্যাসরত থাকেন এবং দ্বিতীয় দিকে তখনই অনেক কামনার জন্য ব্যাকুল হয়ে যান।

57)যাঁর মধ্যে মন্দবুদ্ধি রয়েছে, তিনি অজ্ঞানী। আত্মতত্ত্বের বিষয়ে তিনি শুনলেও নিজের মুড়তাকে ছাড়তে পারেন না। তিনি সত্য ও অসত্যের মধ্যে ভেদ করতে পারেন না। তথাপি নির্বিকল্প হওয়ার ভান করেন। অনেক বাসনা থেকে আবদ্ধ থেকে তিনি সর্বদা ব্যাকুল থাকেন।

58)যে তত্ব জ্ঞানী পুরুষ নিজের বোধকে জাগরিত করে সকল প্রকার কর্ম কে ক্ষীন করে দিয়েছেন, তিনি বাইরে থেকে দেখে তো কর্মরত মনে হন, কিন্তু এমন নয় যে তিনি কর্তা হওয়াটা স্বীকার করেন, তিনি অকর্তা হয়ে থেকে যান।

59)নির্বিকার আত্ম জ্ঞানী পুরুষ সর্বদা অভয় প্রাপ্ত থাকেন। তাঁর জন্য জীবনে অন্ধকার নেই, আলো নেই, ত্যাগও নেই। তাঁর জন্য তার জন্য সর্বত্র শূন্যতা থাকে।

60)যে ব্যক্তি কোন বিষয়বস্তুতে আসক্তি রাখেন না, তার কথাবার্তায় মৌন ভাব, এমন অনির্বচনীয় স্বভাব থেকে মুক্ত যোগীর জন্য বিবেক, নির্ভয়তা, এসব বিষয়বস্তুর কোন মহত্ব থাকে না।

61)তত্ব জ্ঞানী পুরুষের জন্য স্বর্গ বা নরকের কোন মহত্ব নেই। তিনি তো জীবন এবং মুক্তি কে স্বীকার করেন না। এর থেকে বেশি আর কি বলা যায়? তাঁর জন্য যোগ দৃষ্টি থেকেও যোগ সংযোগ এর কিছু মহত্ব নেই।

62)আত্ম জ্ঞানী ব্যক্তি শীতল চিত্ত শান্ত এবং অমৃতরূপী আত্মতত্ত্ব দ্বারা পূর্ণ থাকেন। তিনি আত্মজ্ঞান লাভের জন্য প্রয়োগ ও প্রার্থনাও করেন না। এবং হানি র জন্য শোকও করেন না।

63)তথ্য জ্ঞানী মহাপুরুষ সমদর্শী হন। তিনি সর্বদা অদৈত থাকেন তাঁর কোথাও কোন ভেদ অনুভূতি হয় না। তিনি সমস্ত কামনা থেকে মুক্ত এবং শান্ত। তিনি কারো নিন্দাও করেন না কারো স্তুতিও করেন না। সম্পূর্ণরূপে সন্তুষ্ট হয়ে তিনি যাই করুন, তার ফল দ্বারাও আকৃষ্ট হন না।

64)ধৈর্যশীল তত্বজ্ঞানী মহাপুরুষ সংসারের প্রতি দ্বেষ করেন না,এবং নিজে আত্মাকে দেখার চেষ্টাও করেন না। সুখ-দুখ থেকে মুক্ত হয়ে তিনি জন্ম মরন থেকে থেকেও মুক্ত হয়ে যান।

65)তত্বজ্ঞানী পুরুষ সর্বদা মোহ থেকে মুক্ত থাকেন। অতএব তাঁর প্রিয়জন, পত্নী, সন্তান, অধিকার এসব থেকে মোহ উৎপন্ন হয় না, বিষয়ের প্রতি তাঁর কোন কামনা থাকেনা। তিনি নিজ দেহে থেকেও নির্দেহী থেকে নিষ্কামরূপে বিরাজমান এবং শোভায়মান থাকে না।

66)তত্ত্ব জ্ঞানী ব্যক্তি সর্বত্র এবং সর্বদা সন্তুষ্ট থাকেন। তিনি কর্মকে সহজ রূপে করতে থাকেন এবং সন্তুষ্ট থাকেন। স্বতন্ত্র রূপে তিনি সর্বত্র ব্যাপ্ত থাকেন এবং যেখানেই সূর্যাস্ত হয়ে যাক তিনি সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েন।

67)আত্মজ্ঞানী পুরুষ নিজস্বভাবে স্থিত থেকে জগতের সকল সংস্কার কে বিস্তৃত করে দিয়ে পূর্ণ নিশ্চিন্ত রূপে থাকেন। তাঁর নিজ দেহে থাকার অভিমান থাকে না।

68)বোধিত্বকে প্রাপ্ত  করা জ্ঞানী সকল আশ্রম থেকে মুক্ত থাকেন।তিনি বিধি নিষেধের প্রতি উদাসীন থাকেন। পূর্ণরূপে নির্দয়িত সন্দেহ রহিত, ভাব ও অভাব থেকে অনাসক্ত হয়ে নির্বিকার ভাবে, আত্মসরূপে রমিত থাকেন।

69) ধৈর্যশীল তত্ব জ্ঞানী, মমত্ব মুক্ত, সমদর্শী ব্যক্তি যিনি স্বর্ণ এবং মাটির মধ্যে ভেদ রাখেন না, তিনি মনের সকল বন্ধনকে খুলে দিয়ে রজগুণ এবং তমোগুন কে নষ্ট করে দিয়ে আত্ম স্বরূপে সহজ ভাবে শোভায়মান থাকেন।

70)তত্ব জ্ঞানী মুক্ত আত্মা সকল স্থানে, সকল দৃশ্যে এবং সকল পদার্থে অনাসক্ত থাকেন। যাঁর হৃদয়ে বাসনার স্থান থাকে না। যিনি পূর্ণ সন্তুষ্ট থাকেন। তাঁর তুলনা আর কার সাথে করা যেতে পারে?

71)যিনি জেনেও জানেন না, দেখেও দেখেন না, বলেও বলেন না, এরকম বাসনা রহিত সত্যপুরুষ আত্মজ্ঞানীর জন্য, এর থেকে আর বেশি কি হতে পারে।

72)যিনি ভাব এবং অভাব, শ্রেষ্ঠ এবং ও অশ্রেষ্ঠ এর বিচার করার বুদ্ধি কেই গলিয়ে ফেলেছেন। তিনি রাজা হন অথবা ফকির আত্মতত্ত্ববেত্বা হয়ে তিনি শোভায়মান থাকেন।

73)সহজ স্বভাবযুক্ত প্রপঞ্চহীন সত্য যোগীর জন্য কোথায় স্বচ্ছন্দতা থাকে অথবা কোথায় কোন সংকোচ থাকে আর কোথায় বা কোন তত্ত্বের নিশ্চয়তা থাকে। তিনি তো এসবের উপরে।

74)আত্ম জ্ঞানী আত্মবিশ্রামে পূর্ণ সন্তুষ্ট হয়ে, সমস্ত আশাকে নষ্ট করে, সব দুখের উপরে হয়ে যান। তাঁর হৃদয়ের অনুভব অনির্বাচনীয়।

75)তত্ব জ্ঞানী পুরুষ দেখলে মনে হয় তিনি চিন্তা গ্রস্ত আছেন, কিন্তু আসলে তিনি চিন্তামুক্ত থাকেন। সর্ব ইন্দ্রিয় কে ভোগ করতে থাকলে তা তিনি ইন্দ্রিয় থেকে অস্পৃশ্য থাকেন। এই জন্য ইন্দ্রিয় থাকলেও তিনি ইন্দ্রিয়হীন থাকার মত থাকেন। তিনি বুদ্ধিমান হন কিন্তু দেখতে নির্বুদ্ধির মত মনে হয়। তাঁকে অহংকার যুক্ত মনে হয়, কিন্তু তিনি অহংকার মুক্ত থাকেন।

76)আত্মজ্ঞানী পুরুষ না সুখী হন, না দুঃখী হন, তিনি সর্বদা বিরক্ত থাকেন। তিনি আসক্ত মুক্ত থাকেন, মুমুক্ষু থাকেন।

77)তত্ব জ্ঞানী পুরুষ বিক্ষেপের মধ্যেও বিক্ষিপ্ত হন না, সমাধিস্থ হয়েও সমাধিস্থ থাকেন না, জড়তার মধ্যেও তিনি জড় মতো হন না,  এবং পান্ডিত্য সম্পন্ন হলেও তিনি পন্ডিতের মত মনে হন না। তিনি এসবের উপরে।

78)তত্ব জ্ঞানী পুরুষ সম্পূর্ণরূপে বন্ধন মুক্ত থাকেন। সকল স্থিতির মধ্যে তিনি প্রসন্ন থাকেন এবং সমভাবে থাকেন। কর্তব্য থেকে তিনি সন্তুষ্ট এবং তিনি তৃষ্ণা রহিত। কোন কাজ হলো, বা  হল না, কর্মফল নিয়ে তিনি চিন্তিত থাকেন না।

79)আত্মজ্ঞান দ্বারা পরিপূর্ণ সত্য পুরুষের না কোন বন্দনা খুশি করে, আর না নিন্দা করলে ক্রোধ আসে, তিনি জীবন নিয়ে না হর্ষিত হন, না মরণে ব্যাকুল হন, তিনি সব পরিস্থিতিতে সমভাবে থাকেন।

80)পরম শান্ত, আত্মজ্ঞানী পুরুষ না তো জনসমূহের দ্বারা আকর্ষিত হন, আর না বন প্রান্তরের মধ্যে একান্ত প্রিয় হন, তিনি তো যেখানেই থাকেন এবং যে পরিস্থিতিতেই থাকেন, তিনি সেখানেই সমভাবে আত্মস্থিত হয়ে থাকেন।


সংশয় থেকে মুক্ত হয়ে অনায়াস সিদ্ধি কে প্রাপ্তিলাভ করুন।......


(  শ্রী "অষ্টাবক্র গীতা" থেকে "আত্মজ্ঞান" তত্ব সংগৃহিত।)


উপরের এই তথ্য ভালো লাগলে এবং উপকারী মনে হলে অবশ্যই Like  এবং Share করুন।...


আরো পড়ুন:-  "KARMA" A YOGI'S GUIDE to craft your destiny , Ratan Tata, Mukesh Ambani, Azim Premji, Gandhiji, Mandella, Kalam's Quotes

                      Motivational And Inspirational Quotes For Success

                      Dan Lok's Advice  For Success ,   14 Risks you must take for Success

                      চিন্তন করুন এবং সফল হন ,  কেন করবেন ? সেটা জেনে তবেই কাজটি করুন , 

                      জীবনে কম্পাউন্ড ইফেক্ট এর প্রভাব , বাধার মধ্যে দিয়ে পেরিয়েই সফলতা আসে ,

                      অহংকার হলো চরম শত্রু , আত্মজ্ঞান কি , শ্রীমদ্ভাগবত গীতা সার ,

আকর্ষণ সূত্র , সফল না হওয়া পর্যন্ত চেষ্টা ছাড়বেন না , সফল ব্যক্তিদের 11 টি গুন্ , 

                  সফলতার ১০ টি সূত্র , ১০ গুন্ সফল হবেন কিভাবে ?জীবনের আশ্চর্জজনক রহস্য ,

                  ছোট ছোট অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে বড় লক্ষ্য প্রাপ্তি , মহান ব্যক্তিদের সাতটি অভ্যাসTeachings of Premananda Maharaj-1

                ব্যবসার জন্য মুদ্রা লোন PMMY  Loan ,  Inner Engineering by Sadguru Jaggi Vasudev

For Motivational Articles In English visit......www.badisafalta.com 

Post a Comment

0 Comments